init($el.children[0]))">
- মোস্তাক কামাল তুহিন
পুরান ঢাকার টিকাটুলি। চারপাশে ব্যস্ত নগরজীবন, যানবাহনের
শব্দ আর মানুষের অবিরাম ছুটে চলা। আধুনিক ঢাকার এই
ব্যস্ততার মাঝেই কে এম দাস লেনে নীরবে দঁাড়িয়ে আছে সাদা
রঙের এক ঐতিহাসিক প্রাসাদ-রোজ গার্ডেন প্যালেস।
প্রথম দর্শনে এটি হয়তো একটি পুরোনো জমিদারবাড়ি বলেই
মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে গেলেই বোঝা যায়, এটি
নিছক একটি পুরোনো ভবন নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে পুরান
ঢাকার
সামাজিক-সাংস্কৃতিক
জীবন,
ইউরোপীয়
স্থাপত্যের
প্রভাব,
বাংলা
চলচ্চিত্রের
ইতিহাস
এবং
সর্বোপরি
উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
একটি প্রাসাদ-কত শত গল্পের সাক্ষী!গোলাপের বাগান থেকেই
'রোজ গার্ডেন'রোজ গার্ডেনের ইতিহাসের শুরু বিংশ শতাব্দীর
ত্রিশের দশকের গোড়ায়। ব্যবসায়ী ও জমিদার হৃষিকেশ দাস
প্রায় সাত একর জমির ওপর এই বাগানবাড়ি নির্মাণ করেন বলে
বাংলাপিডিয়ায় উলেস্নখ রয়েছে। বিভিন্ন সরকারি ও ঐতিহাসিক
সূত্রে জমির পরিমাণ প্রায় ২২ বিঘা হিসেবেও উলেস্নখ করা
হয়েছে।
বাড়িটির চারপাশে তিনি গড়ে তুলেছিলেন বিস্তৃত ফুলের বাগান।
বিভিন্ন দেশ থেকে গোলাপের চারা এনে বাগান সাজানোর
কথাও ঐতিহাসিক বিবরণে পাওয়া যায়। সেই মনোমুগ্ধকর
গোলাপবাগান
থেকেই
ভবনটির
নাম
হয়ে
যায়-রোজ
গার্ডেন।তখনকার ঢাকা আজকের মতো কংিμটের নগরী ছিল
না। বড় বড় বাগানবাড়ি, পুকুর, খোলা জায়গা এবং নান্দনিক
স্থাপত্য শহরের সেন্দৗর্যকে অন্য মাত্রা দিয়েছিল। রোজ গার্ডেন
ছিল
সেই
পুরোনো
ঢাকারই
এক
উজ্জ্বল
নিদর্শন।বলধা
গার্ডেনের গল্প-ইতিহাস না জনশ্রুতি?রোজ গার্ডেনের জন্মকাহিনি
ঘিরে একটি বহুল প্রচলিত গল্প রয়েছে।
কথিত আছে, হৃষিকেশ দাস ওয়ারীর বলধা গার্ডেনের একটি
অনুষ্ঠানে
গিয়ে
সামাজিক
মর্যাদার
কারণে
অপমানিত
হয়েছিলেন। সেই ঘটনার প্রতিিμয়ায় তিনি নাকি এমন একটি
বাগানবাড়ি নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেন, যা সেন্দৗর্য ও আভিজাত্যে
সবাইকে ছাড়িয়ে যাবে।গল্পটি নিঃসন্দেহে আকর্ষণীয়। কিন্তু
ইতিহাসের বিচারে এখানে সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ঘটনাটির
পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রাথমিক দলিল সহজলভ্য নয়। ফলে এটিকে
প্রচলিত জনশ্রুতি হিসেবেই দেখা ভালো-নিশ্চিত ঐতিহাসিক
সত্য হিসেবে নয়।ইতিহাসের সেন্দৗর্য এখানেই-কোনটি দলিল,
আর কোনটি লোকমুখে বেঁচে থাকা গল্প, সেই পার্থক্যটিও
আমাদের মনে রাখতে হয়।'রশীদ মঞ্জিল' নামেও পরিচিত
হয়েছিল রোজ গার্ডেনের মালিকানা হৃষিকেশ দাসের হাতে
দীর্ঘদিন থাকেনি। ব্যবসায়িক দুরবস্থার কারণে তিনি ১৯৩৬
সালে প্রাসাদটি খান বাহাদুর মেলৗভী কাজী আবদুর রশীদের
কাছে বিিμ করেন। নতুন মালিক ভবনটির নাম দেন 'রশীদ
মঞ্জিল'।কিন্তু মানুষের মুখে পুরোনো নামটিই থেকে যায়-রোজ
গার্ডেন।পরবর্তীতে ১৯৬৬ সালে সম্পত্তির মালিকানা কাজী
পরিবারের অন্য সদস্যদের হাতে যায় এবং একসময় এটি স্থানী
-
য়ভাবে 'হুমায়ূন সাহেবের বাড়ি' নামেও পরিচিতি লাভ করে।
তবু 'রোজ গার্ডেন' নামটিই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে শি
ক্ত
শালী
পরিচয়ে পরিণত হয়।স্থাপত্যে ইউরোপীয় ছেঁায়ারোজ গার্ডেনের
অন্যতম বড় আকর্ষণ এর স্থাপত্য।প্রায় ৪৫ ফুট উঁচু দ্বিতল
ভবনটির আয়তন প্রায় সাত হাজার বর্গফুট। ভবনটির নকশায়
করিন্থীয়-গ্রিক স্থাপত্যশৈলীর প্রভাব স্পষ্ট। সুউচ্চ স্তম্ভ, খিলান,
অলংকৃত জানালা, বারান্দা, গম্বুজসদৃশ উপাদান এবং সূক্ষ্ণ
নকশা পুরো ভবনটিকে দিয়েছে এক অনন্য সেন্দৗর্য।
প্রবেশদ্বার, জানালা ও অন্যান্য অংশে কাঠ, রঙিন কাচ ও
লোহার সমন্বয়ে তৈরি অলংকরণ ভবনটির নান্দনিকতা আরও
বাড়িয়েছে। উপরের তলায় ছিল বিশাল হলঘর বা বলরুম,
যেখানে
সামাজিক
অনুষ্ঠান
ও
সাংস্কৃতিক
আয়োজন
হতো।ভবনের সঙ্গে ছিল বাগান, পুকুর, ফোয়ারা এবং নানা
অলংকার। সব মিলিয়ে এটি ছিল শুধু বসবাসের জন্য নির্মিত
বাড়ি নয়; বরং তৎকালীন অভিজাত নাগরিক জীবনের রুচি ও
ঐশ্বর্যেরও প্রকাশ।২৩ জুন ১৯৪৯-ইতিহাসের মোড় ঘোরানো
এক দিনরোজ গার্ডেনের ইতিহাসে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়
নিঃসন্দেহে ১৯৪৯ সালের ২৩ জুন।
বাংলাপিডিয়া অনুযায়ী, এই ভবনেই পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী
মুসলিম লীগ প্রতিষ্ঠার উদ্যোগের সঙ্গে সংশিস্নষ্ট গুরুত্বপূর্ণ সভা
অনুষ্ঠিত হয়। ঐতিহাসিক বিবরণে এটিকে দলটির প্রতিষ্ঠার স্থান
হিসেবে উলেস্নখ করা হয়েছে।দলের সভাপতি নির্বাচিত হন
মাওলানা
আবদুল হামিদ খান
ভাসানী,
সাধারণ সম্পাদক
শামসুল
হক
এবং
শেখ
মুজিবুর
রহমান-যিনি
তখন
কারাবন্দি-যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকদের একজন হন। আতাউর
রহমান
খানসহ
আরও
কয়েকজন
নেতা
দলটির প্রাথমিক
নেতৃত্বে
গুরুত্বপূর্ণ
দায়িত্ব
পান।এই
ঘটনাই
পরবর্তীকালে
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ধারার সূচনা
করে।
১৯৫৫ সালে দলের নাম থেকে 'মুসলিম' শব্দটি বাদ দিয়ে 'পূর্ব
পাকিস্তান
আওয়ামী
লীগ'
নাম
গ্রহণ
করা
হয়।
পরবর্তী
ইতিহাসে
এই
দলই
বাংলাদেশের
স্বাধীনতা
আন্দোলনের
অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক শি
ক্ত
তে পরিণত হয়।তাই রোজ
গার্ডেন শুধু একটি স্থাপত্য নয়-এটি বাংলাদেশের রাজনৈতিক
ইতিহাসেরও এক গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতিচিহ্ন।
রাজনীতির পাশাপাশি চলচ্চিত্রেরও ঠিকানা রোজ গার্ডেনের গল্প
শুধু রাজনীতিতে থেমে নেই। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাংলা
চলচ্চিত্রের ইতিহাসও।
ষাটের দশকের মাঝামাঝি থেকে ভবনটি বেঙ্গল স্টুডিও অ্যান্ড
মোশন পিকচার্স-এর সঙ্গে যু
ক্ত
হয়। পরবর্তীতে ঐতিহাসিক ও
জমিদারবাড়িকেন্দ্রিক চলচ্চিত্র নির্মাণের জন্য জায়গাটি জনপ্রিয়
শুটিং স্পটে পরিণত হয়।'হারানো দিন' চলচ্চিত্রের শুটিংও
এখানে
হয়েছিল
বলে
ঐতিহাসিক
বিবরণে
উলেস্নখ
রয়েছে।ভাবতে ভালো লাগে-একই প্রাসাদের দেয়াল একদিকে
শুনেছে
রাজনৈতিক
ভবিষ্যৎ
নিয়ে
নেতাদের
আলোচনা,
অন্যদিকে দেখেছে চলচ্চিত্রের ক্যামেরা, আলো ও অভিনয়ের
দৃশ্য।রাজনীতি
ও
সংস্কৃতি-দুই
জগতেরই
সাক্ষী
রোজ
গার্ডেন।সংরক্ষণের পথে দীর্ঘ যাত্রা
সময়ের সঙ্গে রোজ গার্ডেনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব আরও স্পষ্ট
হয়ে
ওঠে।২১
ডিসেম্বর
১৯৮৯
রোজ
গার্ডেনকে
প্রত্নতত্ত্ব
অধিদপ্তরের সংরক্ষিত স্থাপনার তালিকায় অন্তর্ভু
ক্ত
করা হয়।
তবে পরবর্তী সময়ে মালিকানা নিয়ে আইনি জটিলতাও সৃষ্টি
হয়। ১৯৯৩ সালে আদালতের মাধ্যমে কাজী আবদুর রশীদের
পরিবারের
পক্ষ
থেকে
মালিকানা
পুনরুদ্ধার
করা
হয়।
পরবর্তীতে মালিকানা যায় কাজী আবদুর রকীবের স্ত্রী লায়লা
রকীবের হাতে।অবশেষে ২০১৮ সালে বাংলাদেশ সরকার রোজ
গার্ডেন প্যালেস অধিগ্রহণ করে। μয়মূল্য ছিল ৩৩১ কোটি ৭০
লাখ ২ হাজার ৯০০ টাকা।
সরকারি উদ্যোগের লক্ষ্য ছিল ঐতিহাসিক স্থাপনাটিকে সংরক্ষণ
করা এবং এর সঙ্গে জড়িত ইতিহাসকে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে
তুলে ধরা।
ঐতিহ্য থেকে জাদুঘরের পথে রোজ গার্ডেনকে ঘিরে সরকারি
সংরক্ষণ কার্যμম পরবর্তীতেও এগিয়েছে। প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের
তথ্য
অনুযায়ী,
'ঐতিহাসিক
রোজ
গার্ডেনের
প্রত্নতাত্ত্বিক
সংস্কার-সংরক্ষণ এবং ঢাকা মহানগর জাদুঘর স্থাপন' নামে
একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছিল।অর্থাৎ রোজ গার্ডেনকে শুধু
একটি পুরোনো ভবন হিসেবে নয়, বরং নগরের ইতিহাস ও
ঐতিহ্য সংরক্ষণের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হিসেবে দেখার
উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।আজও কেন এত গুরুত্বপূর্ণ রোজ
গার্ডেন?কারণ রোজ গার্ডেনের ইতিহাস একমাত্রিক নয়।
এখানে রয়েছে-
স্থাপত্যের ইতিহাস,পুরান ঢাকার সামাজিক ইতিহাস,অভিজাত
নাগরিক
জীবনের
স্মৃতি,বাংলা
চলচ্চিত্রের
স্মৃতি,এবং
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
একটি ভবনের ইতিহাসে এতগুলো ধারার একসঙ্গে মিলন
সত্যিই বিরল।আজ চারপাশের ঢাকা বদলে গেছে। যে শহরে
একসময় বাগানবাড়ি, পুকুর ও খোলা জায়গা ছিল, সেখানে
এখন বহুতল ভবন, যানজট ও ব্যস্ত নগরজীবন। কিন্তু সেই
পরিবর্তনের মধ্যেও রোজ গার্ডেন দঁাড়িয়ে আছে-একটি সময়ের
স্মারক হয়ে।
শেষ কথা
রোজ গার্ডেনের সামনে দঁাড়ালে মনে হয়, ইতিহাস কখনো শুধু
বইয়ের পাতায় থাকে না। কখনো ইতিহাস দঁাড়িয়ে থাকে একটি
ভবনের দেয়ালে, একটি পুরোনো জানালায়, একটি পুকুরের
জলে কিংবা হারিয়ে যাওয়া একটি বাগানের স্মৃতিতে।একসময়
এখানে ছিল গোলাপের বাগান।ছিল অভিজাতদের সামাজিক
আসর।ছিল 'রশীদ মঞ্জিল' নামের পরিচয়।এসেছিল চলচ্চিত্রের
ক্যামেরা।
আর একদিন এই প্রাসাদ হয়ে উঠেছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ
রাজনৈতিক ইতিহাসের মঞ্চ।গোলাপ হয়তো আগের মতো ফুটে
না,কিন্তু গোলাপের সেই বাগানের গল্প আজও ফুটে আছে
ইতিহাসের পাতায়।সময় বদলেছে। মানুষ বদলেছে। বদলে
গেছে
টিকাটুলির
চারপাশের
নগরচিত্র।কিন্তু
রোজ
গার্ডেন
এখনো
দঁাড়িয়ে
আছে।গোলাপ
শুকিয়ে
গেছে-গল্প
শুকায়নি।সময় চলে গেছে-ইতিহাস রয়ে গেছে।
পুরান ঢাকার বুকের এই প্রাসাদ তাই শুধু একটি পুরোনো বাড়ি
নয়-এটি আমাদের অতীতকে ছুঁয়ে দেখার একটি দরজা।
তথ্য কৃতজ্ঞতা রোজ গার্ডেন প্যালেসের ইতিহাস, স্থাপত্য,
রাজনৈতিক
তাৎপর্য
ও
সংরক্ষণ-সংμান্ত
তথ্যের
জন্য
বাংলাদেশের প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর, বাংলাদেশ জাতীয় জ্ঞানকোষ
(বাংলাপিডিয়া), বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন এবং সরকারি
ও নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রকাশনা ও সংবাদসূত্রের প্রতি
কৃতজ্ঞতা।
- মোস্তাক কামাল তুহিন
কলামিস্ট
রোজ গার্ডেন: গোলাপের বাগান থেকে ইতিহাসের পাতায়
পুরান ঢাকার টিকাটুলিতে দঁাড়িয়ে থাকা যে প্রাসাদে মিশে আছে
স্থাপত্য, চলচ্চিত্র ও বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাস
