init($el.children[0]))">
শিক্ষা ও চাকুরির অমিল: হারিয়ে
যাচ্ছে তরুণদের ভবিষ্যৎ
বাংলাদেশ আজ এক অদ্ভুত বাস্তবতার মুখোমুখি। একদিকে
উচ্চশিক্ষায়
অভূতপূর্ব
সম্প্রসারণ,
অন্যদিকে
শিক্ষিত
বেকারের
দীর্ঘ
লাইন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের
সংখ্যা
বাড়ছে,
প্রতিবছর লাখ
লাখ
তরুণ
ডিগ্রি অর্জন
করছে,
কিন্তু
কর্মসংস্থানের বাজার সেই অনুপাতে তৈরি হচ্ছে না। ফলে
শিক্ষা ও চাকুরির বাজারের মধ্যে তৈরি হয়েছে গভীর
অসামঞ্জস্যতা। এই বৈপরীত্য শুধু অর্থনৈতিক সংকট নয়,
এটি এখন সামাজিক অস্থিরতা, হতাশা ও জাতীয় উন্নয়নের
জন্যও বড় হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
বাংলাদেশ
পরিসংখ্যান
ব্যুরো
(বিবিএস)-এর
শ্রমশি
ক্ত
জরিপ ২০২৪ অনুযায়ী দেশে মোট বেকারের সংখ্যা প্রায়
২৬ লাখ ২৪ হাজার। এর মধ্যে প্রায় ৮ লাখ ৮৫ হাজারই
বিশ্ববিদ্যালয় স্নাতক। অর্থাৎ মোট বেকারের বড় একটি
অংশই
উচ্চশিক্ষিত
তরুণ।
বিশ্ববিদ্যালয়
স্নাতকদের
বেকারত্বের হার ১৩.৫৪ শতাংশ, যা সব শিক্ষাস্তরের মধ্যে সর্বোচ্চ।সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো,
শিক্ষিত তরুণদের একটি বড় অংশ স্নাতক শেষ করার পর এক থেকে দুই বছর পর্যন্ত চাকরি খুঁজেও
কর্মসংস্থান পাচ্ছে না। বিবিএসের তথ্য অনুযায়ী প্রতি তিনজন স্নাতকের একজন দীর্ঘ সময় বেকার
থাকছে। এটি কেবল ব্যি
ক্ত
গত ব্যর্থতা নয়; বরং রাষ্ট্রের শিক্ষা পরিকল্পনা ও শ্রমবাজারের মধ্যে
সমন্বয়হীনতার প্রতিফলন।আজকের বাস্তবতায় বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয় এখনও এমন
শিক্ষাব্যবস্থা অনুসরণ করছে, যা মূলত সনদনির্ভর, দক্ষতানির্ভর নয়। শ্রেণিকক্ষে তাত্ত্বিক জ্ঞানের
আধিক্য থাকলেও বাস্তবমুখী প্রশিক্ষণ, গবেষণা, ইন্টার্নশিপ, সমস্যা সমাধান দক্ষতা কিংবা প্রযুি
ক্ত
গত
সক্ষমতা তৈরির দিকে পর্যাপ্ত গুরুত্ব নেই। ফলে শিক্ষার্থীরা পরীক্ষায় ভালো ফল করলেও কর্মক্ষেত্রের
চাহিদা অনুযায়ী নিজেদের প্রস্তুত করতে পারছে না।বর্তমান বিশ্বে চাকরির বাজার দ্রুত বদলে যাচ্ছে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, অটোমেশন, ডাটা অ্যানালিটিক্স, সাইবার সিকিউরিটি, সফট স্কিল ও যোগাযোগ
দক্ষতা এখন চাকরির মূল যোগ্যতা হয়ে উঠছে। কিন্তু বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ের
পাঠ্যμম এখনও পুরোনো কাঠামোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ। শিল্পকারখানা, প্রযুি
ক্ত
খাত ও করপোরেট
জগতের চাহিদার সঙ্গে শিক্ষাμমের সংযোগ অত্যন্ত দুর্বল। ফলে শিক্ষার্থীরা ডিগ্রি অর্জন করেও "জব-
রেডি" হয়ে উঠতে পারছে না। আরেকটি বড় সংকট হল্তোদেশে উচ্চশিক্ষার বিস্তার ঘটলেও কর্মমুখী
ও কারিগরি শিক্ষার প্রতি এখনো সামাজিক অনীহা রয়েছে। পরিবারগুলো সন্তানকে ডা
ক্ত
ার, ইঞ্জিনিয়ার
বা বিসিএস ক্যাডার হিসেবে দেখতে চায়, কিন্তু দক্ষ কারিগরি পেশাজীবী হিসেবে গড়ে তুলতে চায়
না। ফলে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির চাপ বাড়ছে, অথচ শিল্পখাতে দক্ষ কর্মীর সংকট থেকেই যাচ্ছে।
বাস্তবতা হলো, বাংলাদেশে অনেক শিল্পপ্রতিষ্ঠান দক্ষ কর্মীর অভাবে বিদেশি কর্মী নিয়োগ দেয়, অথচ
দেশের শিক্ষিত তরুণরা বেকার ঘুরে বেড়ায়।এই অসামঞ্জস্যতার পেছনে আরেকটি কারণ হলো
পরিকল্পনাহীন উচ্চশিক্ষা সম্প্রসারণ। গত দুই দশকে দেশে সরকারি ও বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের
সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে। কিন্তু সেই অনুপাতে শিক্ষার মান, গবেষণা সুবিধা, আধুনিক ল্যাব, দক্ষ
শিক্ষক কিংবা শিল্পখাতের সঙ্গে সংযোগ তৈরি হয়নি। অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যত "সনদ উৎপাদন কেন্দ্র"-
এ পরিণত হয়েছে। ফলাফল্তডিগ্রিধারীর সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি হচ্ছে না।শুধু
তাই নয়, সরকারি চাকরির প্রতি অতিরি
ক্ত
নির্ভরশীলতাও সংকটকে গভীর করেছে। প্রতিবছর কয়েক
হাজার সরকারি পদের জন্য লাখ লাখ তরুণ আবেদন করছে। কারণ বেসরকারি খাতে চাকরির
নিরাপত্তা, সম্মানজনক বেতন ও সামাজিক মর্যাদার ঘাটতি রয়েছে। ফলে তরুণদের বড় অংশ বছরের
পর বছর বিসিএস বা সরকারি চাকরির প্রস্তুতিতে সময় ব্যয় করছে। এতে কর্মজীবনে প্রবেশ বিলম্বিত
হচ্ছে এবং উৎপাদনশীলতা কমছে।শিক্ষা ও চাকুরির বাজারের এই বিচ্ছিন্নতা শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি
করছে না; এটি সামাজিক হতাশাও বাড়াচ্ছে। দীর্ঘদিন বেকার থাকার কারণে তরুণদের মধ্যে মানসিক
চাপ, আত্মবিশ্বাসহীনতা ও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে। অনেকেই বিদেশমুখী হচ্ছে, আবার কেউ কেউ
হতাশা থেকে অপরাধ বা মাদকের দিকেও ঝুঁকছে। একটি রাষ্ট্রের সবচেয়ে শি
ক্ত
শালী সম্পদ তার
তরুণ জনগোষ্ঠী। সেই জনগোষ্ঠী যদি হতাশায় নিমজ্জিত হয়, তবে তা জাতির ভবিষ্যতের জন্য
অশনিসংকেত। এই সংকট থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমেই শিক্ষাব্যবস্থাকে শ্রমবাজারমুখী করতে হবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যμম আধুনিক ও যুগোপযোগী করতে হবে। শিল্পখাত, আইটি খাত, কৃষি, স্বাস্থ্য
ও উদ্যো
ক্ত
া উন্নয়নের সঙ্গে সরাসরি সংযু
ক্ত
কোর্স চালু করতে হবে। শুধু জিপিএ নয়, বাস্তব দক্ষতা
ও
সৃজনশীলতাকে মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হবে।প্রতিটি
বিশ্ববিদ্যালয়ে বাধ্যতামূলক
ইন্টার্নশিপ,
ক্যারিয়ার
কাউন্সেলিং
ও
ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া
সংযোগ
জোরদার
করা
জরুরি।
শিক্ষার্থীদের সফট স্কিল, ইংরেজি যোগাযোগ দক্ষতা, প্রযুি
ক্ত
ব্যবহার ও উদ্যো
ক্ত
া হওয়ার প্রশিক্ষণ
দিতে হবে। একই সঙ্গে কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষাকে সামাজিক মর্যাদা দিতে হবে। উন্নত
দেশগুলোর মতো "স্কিল-বেইজড ইকোনমি" গড়ে তুলতে না পারলে শুধু ডিগ্রি দিয়ে বেকারত্ব কমানো
সম্ভব হবে না।সরকারেরও দীর্ঘমেয়াদি মানবসম্পদ পরিকল্পনা প্রয়োজন। কোন খাতে আগামী দশ
বছরে কত দক্ষ জনবল লাগবে, সে অনুযায়ী শিক্ষা নীতি নির্ধারণ করতে হবে। গবেষণা, উদ্ভাবন ও
প্রযুি
ক্ত
নির্ভর শিল্পে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে কর্মপরিবেশ ও বেতন
কাঠামো উন্নত করতে হবে, যাতে তরুণরা শুধু সরকারি চাকরির পেছনে না ছুটে বহুমুখী কর্মক্ষেত্রে
আগ্রহী হয়। বাংলাদেশ এখন জনমিতিক সুবিধার একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় পার করছে। দেশের বিপুল
তরুণ জনগোষ্ঠীকে যদি দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করা যায়, তবে এটি অর্থনৈতিক উন্নয়নের সবচেয়ে
বড় শি
ক্ত
হতে পারে। কিন্তু শিক্ষা ও চাকুরির বাজারের এই অসামঞ্জস্যতা দূর করা না গেলে আজকের
তরুণ জনগোষ্ঠীই আগামী দিনের সবচেয়ে বড় হতাশায় পরিণত হবে। ডিগ্রি নয়, দক্ষতাই এখন
সময়ের দাবি। শিক্ষা যদি কর্মসংস্থানের পথ না দেখায়, তবে সেই শিক্ষা শুধু সনদের ভার বাড়ায়্ত
ভবিষ্যতের সম্ভাবনা নয়।
লেখক: অধ্যাপক, গবেষক ও কলামিস্ট; বাংলাদেশ উন্মু
ক্ত
বিশ্ববিদ্যালয়।
প্রফেসর ড. মোঃ আবু তালেব
