init($el.children[0]))">
আমরা
সাধারণত
বলে
থাকি,
১৭৫৭
সালে
পলাশীর
আম্রকাননে নবাব
সিরাজ-উদ-দেলৗার পতনের মধ্য
দিয়ে
বাংলার স্বাধীনতার সূর্য অস্তমিত হয়েছিল। এরপর দীর্ঘ ব্রিটিশ
শাসন পেরিয়ে ১৯৭১-এর আগে
এই ভূখণ্ড আর পূর্ণাঙ্গ
স্বাধীনতা দেখেনি। কিন্তু একটু পেছনে ফিরে তাকালে একটি
মৌলিক
প্রশ্ন
মনে
জাগ্তেমুঘল
শাসন
কি
টেকনিক্যালি
আমাদের জন্য 'বহিরাগতদের শাসন' ছিল না? মায়ের দিক
থেকে চেঙ্গিস খান আর বাবার দিক থেকে তৈমুর লং-এর র
ক্ত
বহন করা সম্রাট বাবর ছিলেন এই উপমহাদেশের বাইরের এক
শি
ক্ত।
সম্রাট অশোকের পর এই অঞ্চলে এত বড় সাম্রাজ্য আর
কেউ গড়তে পারেনি।
কিন্তু এই অপরাজেয় মুঘল শি
ক্ত
কেও পদে পদে থমকে যেতে
হয়েছিল একটি বিশেষ অঞ্চলের কাছ্তেতা হলো আমাদের এই
নদীমাতৃক বাংলা এবং বাংলার অদম্য 'বারো ভূঁইয়ারা'। আজ
থেকে প্রায় ৪০০ বছর আগের ঘটনা হওয়ায় বহু ইতিহাস আজ
লোককথার রূপ নিয়েছে। তবে পুরো উপমহাদেশে মুঘলদের
বিজয়ডঙ্কা বাজলেও, এই বাংলার মাটিতে তারা প্রায় ৪০ বছর
ধরে শাসন কায়েম করতে পারেন্তিএটি এক অনস্বীকার্য সত্য।
আর এই প্রতিরোধ পর্বেই সোনারগঁাওয়ের বৈভব মুগ্ধ করেছিল
ইবনে
বতুতা,
মাহুয়ান
কিংবা
রালফ
ফিচের
মতো
বিশ্বপরিব্রাজকদের।
বারো ভূঁইয়ার গোলকধঁাধা এবং ঈসা খঁার উত্থান
শুরুতেই একটি ঐতিহাসিক বিভ্রান্তি দূর করা প্রয়োজন। 'বারো
ভূঁইয়ার' বারো সংখ্যাটি কিন্তু আক্ষরিক অর্থে ১২ জন শাসককে
বোঝায় না। ঐতিহাসিক কৈলাশ চন্দ্র সিংহের মতে, আকবরের
জন্মের আগে পাঠান আমলে বাংলা ১২টি প্রশাসনিক ভাগে বা
'ভাটি' অঞ্চলে বিভ
ক্ত
ছিল, যার শাসকেরা সম্মিলিতভাবে বারো
ভূঁইয়া
নামে পরিচিত
হন।
অন্যদিকে
দুর্গাচন্দ্র
সান্যালের
'বাংলার সামাজিক ইতিহাস' বইয়ে দাবি করা হয়েছে, এটি
আসলে 'বড় ভূঁইয়া' শব্দের অপভ্রংশ। প্রকৃতপক্ষে শি
ক্ত
শালী
শাসক কখনো ৯ জন, কখনো ১৬ জন ছিলেন। এরা পুরোপুরি
স্বাধীন না হলেও দিলিস্ন থেকে দূরত্বের সুযোগ নিয়ে স্বাধীনচেতা
রাজার মতোই চলতেন।
১৫৭৬ সালে রাজমহলের যুদ্ধে মুঘলদের হাতে আফগান শাসক
দাউদ খঁা কররানীর মৃত্যুর পর বাংলার ভাগ্যাকাশে মেঘ জমতে
শুরু করে। স্থানীয় হিন্দু-মুসলিম ভূঁইয়ারা বুঝতে পেরেছিলেন,
মুঘলরা শুধু রাজস্ব নিয়ে শান্ত থাকবে না, পুরো বাংলা গ্রাস
করতে আসবে। এই অস্তিত্বের সংকটই তঁাদের এক সুতোয়
বঁাধে,
যার
অবিসংবাদী
নেতা
হিসেবে
উত্থান
ঘটে
সোনারগঁাওয়ের ঈসা খঁার।
মুসলিম ঐতিহাসিকদের চোখে ঈসা খঁা ছিলেন 'ভাটি অঞ্চলের
অধীশ্বর'। তার ধমণীতে ছিল অযোধ্যার রাজপুত বংশের র
ক্ত।
পিতা কালিদাস গজদানী ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে হোসেন শাহী
মোমেনা খাতুনকে
বিয়ে করেন।
অর্থাৎ, মাতুলালয় সূত্রে
বাংলার রাজকীয় ঐতিহ্য ছিল ঈসা খঁার রে
ক্ত।
শৈশবে পিতাকে
হারিয়ে μীতদাস হিসেবে বিিμ হয়ে যাওয়ার পর মামা কুতুব
খঁার হাত ধরে পুনরায় বাংলায় ফেরা এবং কররানী আমলে
জমিদারি
পুনরুদ্ধার্ততার
জীবন
যেন
কোনো
রোমাঞ্চকর
উপন্যাসের চেয়ে কম নয়।
নেযৗুদ্ধ, কৃত্রিম বন্যা ও কুটনীতির দাবাখেলা
দাউদ খঁার পতনের পর দলছুট আফগান যোদ্ধাদের আশ্রয় দিয়ে
ঈসা খঁা এক বিশাল মুঘল-বিরোধী জোট গড়ে তোলেন।
কটকের সন্ধির সময় মীর-ই-বহর শাহ বরদির নেতৃত্বাধীন মূল
মুঘল নেবৗহরকে যেভাবে ঈসা খঁা আচমকা আμমণে পরাস্ত
করেছিলেন, তা দিলিস্নর রাজদরবারে কঁাপন ধরিয়ে দিয়েছিল।
মুঘলরা
বারবার
বাংলার
স্বাধীনতা
হরণ
করতে
সেনা
পাঠিয়েছে, আর ঈসা খঁা প্রতিবারই তাদের ফিরিয়ে দিয়েছেন
এক-একটি নতুন রণকেশৗলে। ১৫৭৮ সালের বর্ষা মেসৗুমে
সুবেদার খান জাহান যখন ভেবেছিলেন নদীমাতৃক বাংলায়
বর্ষায় আμমণ করে ঈসা খঁাকে চমকে দেবেন, ঈসা খঁা তখন
উল্টো রণনীতি সাজান। বর্তমান কিশোরগঞ্জের অষ্টগ্রামের
কাছে তাইথলের যুদ্ধে মুঘলদের কামানের মুখে শুরুতে ভূঁইয়ারা
ছত্রভঙ্গ
হলেও,
মুঘল
সেনাদের
লুটপাটের
ব্যস্ততা
এবং
আকস্মিক বৃষ্টির সুযোগ নিয়ে ঈসা খঁা, মজলিস দিলোয়ার ও
মজলিস প্রতাপের ছোট বাহিনী চিতার গতিতে পাল্টা আঘাত
হানে। নিশ্চিত বিজয় হাতছাড়া করে কোনোমতে প্রাণ বঁাচিয়ে
ফেরে মুঘল বাহিনী।
ঈসা খঁার শ্রেষ্ঠত্ব শুধু যুদ্ধক্ষেত্রেই ছিল না, তিনি ছিলেন একজন
ঝানু কূটনীতিবিদ। ১৫৭৯ সালে বাংলার মুঘল সৈন্যদের ভেতর
আকবরের ধর্মীয় ও রাজস্ব নীতির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ ফেটে পড়লে
ঈসা খঁা সেই সুযোগের পূর্ণ ব্যবহার করেন। মুঘল বিদ্রোহী
নেতা মাসুম খান কাবুলিকে বুকে টেনে নেন। ত্রিপুরা রাজ অমর
মাণিক্যের সাথে কেশৗলগত মিত্রতা করেন। ১৫৮৪ সালের
মধ্যে
ঢাকা,
ময়মনসিংহ,
সোনারগঁাও,
এগারসিন্দুর
ও
বাজিতপুরকে যু
ক্ত
করে পুরো বাংলাকে এক দুর্ভেদ্য সামরিক
দুর্গে পরিণত করেন তিনি।
আকবরের অন্যতম শ্রেষ্ঠ সেনাপতি শাহবাজ খান কামবোহ
যখন ১৫৮৩ সালে বিশাল অশ্বারোহী বাহিনী নিয়ে বাংলা
অভিযানে আসেন, তখনো ঈসা খঁা তাকে মুখোমুখি যুদ্ধের চেয়ে
'গেরিলা' ও 'প্রক্সি' যুদ্ধে ব্যস্ত রাখেন। শাহবাজ খান যখন
সন্ধির প্রস্তাব দেন, ঈসা খঁা তখন ব্রহ্মপুত্রের ১৫টি পয়েন্টে বঁাধ
নির্মাণের কাজ করছিলেন। বর্ষা নামতেই সেই বঁাধের মুখ খুলে
দেওয়া হয়। কৃত্রিম বন্যায় ভেসে যায় মুঘলদের অহংকার।
ইতিহাসে বিরল।
মানসিংহের ট্র্যাজেডি ও দিলিস্নর দরবারে স্বীকৃতি
১৫৯৪ সালে বাংলার সুবেদার হয়ে আসেন অপরাজেয় রাজপুত
রাজা মানসিংহ। তিনি এসে বুঝতে পারেন, বাংলা মুঘলদের
কাছে এক 'অভিশপ্ত ও অবাধ্য অঞ্চল' (বিদ্রোহ ভূমি)। মান
-
সিংহের সাথে ঈসা খঁার লড়াই রূপ নেয় এক মনস্তাত্ত্বিক কোল্ড
ওয়ারে।
কামরূপ
ও
কামতার
দুই
ভাইয়ের
(রঘুদেব
ও
ল
ক্ষ্ণ
ীনারায়ণ)
পারিবারিক
বিরোধে
মানসিংহ
ও
ঈসা
খঁা
দুজনেই প্রক্সি ওয়ারে জড়িয়ে পড়েন।
১৫৯৭ সালে মানসিংহের ছেলে দুর্জন সিংহ যখন কত্রাভুতে
আμমণ করেন, তখন বাংলার চিরচেনা বর্ষা আবারও ঈসা খঁার
পক্ষ নেয়।
শীতলক্ষ্যা,
মেঘনা
ও
ধলেশ্বরীর
জলরাশিতে
অবরুদ্ধ হয়ে দুর্জন সিংহ নিহত হন এবং মুঘল বাহিনীর
শোচনীয় পরাজয় ঘটে। একের পর এক পুত্র হারিয়ে মানসিংহ
মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন।
তবে ঈসা খঁা জানতেন, মুঘলদের অন্তহীন জনবল ও সম্পদের
সাথে চিরকাল শুধু যুদ্ধ করে টিকে থাকা সম্ভব নয়। তাই চূড়ান্ত
গেরৗবের মুহূর্তে দঁাড়িয়েও তিনি শান্তির হাত বাড়ান। মান
-
সিংহের মাধ্যমে তিনি সম্রাট আকবরের দরবারে হাজির হন।
আকবর ততদিনে বাংলার এই অবাধ্য বীরের সাহসিকতায়
মুগ্ধ। তিনি ঈসা খঁাকে কোনো শাস্তি বা অপমান না করে উল্টো
২২টি পরগনার জমিদারি এবং লোকমুখে প্রচলিত 'মসনদ-ই-
আলা' উপাধির রাজকীয় স্বীকৃতি দেন। এর বিনিময়ে ঈসা খঁাও
তার জীবনের শেষ দিনগুলোতে দিলিস্নর সাথে আর কোনো দ্বন্দ্বে
জড়াননি।
ইতিহাসের অন্তরালে এক বিস্মৃত নায়ক
১৬০৩ সালে ভাওয়ালের জমিদার বন্ধু ফজল গাজীর বাড়ি
যাওয়ার পথে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে ইতিহাসের এই মহাবীর শেষ
নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। আজ গাজীপুরের কালীগঞ্জের ব
ক্ত
ারপুর
দুর্গের দিঘির পাড়ে নিভৃতে শুয়ে আছেন তিনি।
যে সোনারগঁাওয়ের বৃত্ত ও বৈভবে মুগ্ধ হয়ে চাইনিজ বণিকরা
নিয়মিত আসত, যে ঈসা খঁার আমলেই ৩৬০ আউলিয়ার দল
সোনারগঁাও হয়ে সিলেটে প্রবেশ করেছিল্তআজকের বাঙালি
প্রজন্ম
তাদের
সেই
গেরৗবোজ্জ্বল
অধ্যায়কে
কতটা
মনে
রেখেছে?
আমরা
মারাঠা
বীর
বাজিরাওকে
চিনি,
বাবর-
আকবরের তৈমুরি শের্যৗ চিনি, কিন্তু বাংলার নদী-নালা ব্যবহার
করে দিলিস্নর রাজশি
ক্ত
কে কঁাপিয়ে দেওয়া ঘরের ছেলে ঈসা
খঁাকে আমরা ঠিকঠাক চিনি না। ইতিহাস বড় নিষ্ঠুর, সে
বিজিতের বীরত্বগাথা অনেক সময়ই বিজয়ী শাসকের মহিমার
আড়ালে চাপা দিয়ে দেয়। কিন্তু ৪০০ বছর পরও, যখনই
বাংলার স্বাধিকার আর প্রতিরোধের গল্প উঠবে, 'মসনদ-ই-
আলা' ঈসা খঁার নাম সেখানে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
ইমদাদুল হক, সাংবাদিক ও কলামিস্ট
ইমদাদুল হক
খঁা কি আমাদের শেষ স্বাধীন শাসক?
