init($el.children[0]))">
বিনিয়োগ স্থবিরতার লক্ষণ
বাংলাদেশের
বেসরকারি
খাতে
ঋণপ্রবাহের
ধারাবাহিক
দুর্বলতা এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো পরিসংখ্যানগত ঘটনা
নয়। এটি বরং বিনিয়োগ, উৎপাদন ও কর্মসংস্থানের গতি
কমে যাওয়ার গভীরতর লক্ষণ। দীর্ঘদিন ধরে ঋণপ্রবাহ এমন
দুর্বল
পর্যায়ে
রয়েছে,
যা
বেসরকারি
বিনিয়োগনির্ভর
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সর্বশেষ
তথ্য অনুযায়ী, মার্চ মাসে বেসরকারি খাতে আনুষ্ঠানিক
ঋণপ্রবাহের প্রবৃদ্ধি ঐতিহাসিকভাবে সর্বনিম্ন ৪.৭২ শতাংশে
নেমে
এসেছে।
বেসরকারি
খাতে
এই ব্যতিμমী
দুর্বল
ঋণপ্রবাহ গভীরতর বেসরকারি বিনিয়োগ সংকটের একটি
গুরুত্বপূর্ণ
সতর্ক
সংকেত।
এটি
এমন
এক
পরিস্থিতির
প্রতিফলন,
যেখানে
প্রতিষ্ঠানগুলো
ব্যবসা
সম্প্রসারণে
অনাগ্রহী; ব্যাংকগুলো μমেই সীমাবদ্ধ অথবা ঋণঝুঁকি নিতে
অনিচ্ছুক; ঋণের ব্যয় উচ্চ; সরকারের
অতিরি
ক্ত
ঋণগ্রহণ বেসরকারি খাতের
জন্য
ঋণপ্রাপ্তির
পরিসর
সংকুচিত
করছে
এবং
জ্বালানি,
মূল্যস্ফীতি,
বহিঃপরিবেশ ও বিনিময় হার নিয়ে
অনিশ্চয়তা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তের ওপর
চাপ
সৃষ্টি
করে
চলেছে।
ব্যাংকিং
মধ্যস্থতার
(ফিন্যান্সিয়াল
ইন্টারমিডিয়েশন)
দুর্বলতা
সমস্যার
একটি কেন্দ্রীয় অংশে পরিণত হয়েছে।
স্বাভাবিক
ঋণ
ব্যবস্থায়
ব্যাংকগুলো
যেভাবে
আমানতকে
উৎপাদনশীল
ঋণে রূপান্তর করবে বলে প্রত্যাশিত,
এখন
তা
ঘটছে
না।
μমবর্ধমান
খেলাপি ঋণ, প্রভিশনিং চাপ, মূলধন
ঘাটতি,
আমানতকারীদের
নড়বড়ে
আস্থা
এবং
তারল্য
সংকট
ব্যাংকগুলোর ঋণ দেওয়ার সক্ষমতা
দুর্বল
করেছে।
একই
সঙ্গে
ঋণগ্রহীতাদের মান নিয়ে অনিশ্চয়তা
নতুন
ঋণ
প্রদানে
তাদের
আগ্রহ
কমিয়েছে।
ফলে
ব্যাংকিং
ব্যবস্থা
μমেই বেশি রক্ষণশীল ও ঝুঁকিবিমুখ
হয়ে
উঠছে।
নতুন
বিনিয়োগকে
সহায়তা করার পরিবর্তে এটি নিজের ব্যালান্সশিট (আর্থিক
বিবৃতি) সুরক্ষায় বেশি মনোযোগ দিচ্ছে। বেসরকারি খাতে
ঋণের চাহিদা দুর্বলই রয়ে গেছে। ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনের
আগে
রাজনৈতিক
অনিশ্চয়তার কারণে অনেক
প্রতিষ্ঠান
বিনিয়োগ সিদ্ধান্ত স্থগিত করেছিল বলে মনে হয় এবং
নির্বাচনের পর
বহুল
প্রত্যাশিত
আস্থার পুনরুদ্ধার
দ্রুত
ঘটেনি। এরপর মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জ্বালানি মূল্যের ঝুঁকি
বৃদ্ধি এবং বৈশ্বিক চাহিদা, আমদানিজনিত মূল্যস্ফীতি ও
সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন অনিশ্চয়তা এই
দ্বিধাকে আরও জোরদার করেছে। অনেক প্রতিষ্ঠানের কাছে
অপেক্ষা করাই নিরাপদ বিকল্প হয়ে দঁাড়িয়েছে। ঋণের
চাহিদা গঠনেও এর প্রতিফলন দেখা যায়। মেয়াদি ঋণের
দুর্বল চাহিদা, মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির পতন, কারখানার
সক্ষমতার অপূর্ণ ব্যবহার এবং কারখানা সম্প্রসারণে সীমিত
আগ্রহ
ইঙ্গিত
দেয়,
ব্যবসায়ীরা
শুধু
ব্যয়বহুল
ঋণের
মুখোমুখি নয়, বরং নতুন বিনিয়োগ থেকে প্রত্যাশিত রিটার্ন
সম্পর্কেও তারা নিশ্চিত নয়। এসব সূচক বৃহত্তর বিনিয়োগে
বিরতির ইঙ্গিত দেয়, যেখানে প্রতিষ্ঠানগুলো টিকে থাকা বা
নিয়মিত কার্যμম চালানোর জন্য চলতি মূলধনের ঋণ নিতে
পারে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার এড়িয়ে চলে। বাংলাদেশ
আমদানি সংকোচনের ক্ষেত্রেও এক ব্যতিμমী পর্যায়ের মধ্য
দিয়ে গেছে। ২০২২ সালে আমদানি ৮৮ বিলিয়ন মার্কিন
ডলারের বেশি হয়েছিল, কিন্তু পরবর্তী বছরগুলোতে তা কমে
৭০ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের নিচে থেকেছে। আমদানি
সংকোচন লেনদেন ভারসাম্যের ওপর চাপ কিছুটা কমাতে
সহায়ক হয়ে থাকতে পারে। কিন্তু এর বড় নেতিবাচক
প্রভাবও রয়েছে। মূলধনি পণ্য, মধ্যবর্তী উপকরণ এবং
শিল্পের
কঁাচামালের
আমদানি
কমে
যাওয়ায়
উৎপাদন
সক্ষমতা দুর্বল ও কারখানার কার্যμম ধীর হয়েছে। ফলস্বরূপ
সরবরাহ শৃঙ্খলে পণ্যপ্রবাহ সীমিত থেকেছে বলে ধারণা করা
যায়।
এটি
বিশেষভাবে
গুরুত্বপূর্ণ।
কারণ
অভ্যন্তরীণ
সরবরাহ ব্যাহত হলে তা মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে বাধা হয়ে
দঁাড়ায়। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক সামষ্টিক অর্থনৈতিক সংকট
নীতিনির্ধারকদের
কঠিন
দ্বিধায়
ফেলেছে।
রিজার্ভ
পতন
থামাতে আমদানিকে নিরুৎসাহিত করা জরুরি মনে করা
হয়েছিল। একই সময়ে অর্থনীতি উচ্চ মূল্যস্ফীতির চাপও
বহন করছিল। নজিরবিহীন আমদানি সংকোচন সেই চাপকে
আরও
জটিল
করে
তোলে।
কারণ
এতে
উৎপাদন
ও
সরবরাহের সক্ষমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। রিজার্ভ পতন ঠেকানো,
একই সঙ্গে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা সামষ্টিক অর্থনৈতিক
নীতিনির্ধারকদের
জন্য
সবচেয়ে
কঠিন
চ্যালেঞ্জগুলোর
একটি। তিন বছর ধরে নানা নীতি-প্রচেষ্টার পরও বাংলাদেশ
এই ফঁাদ থেকে বেরিয়ে আসতে পারেনি। বেসরকারি খাতে
ঋণ সরবরাহের ব্যাপারে ব্যাংকগুলো অত্যন্ত সতর্ক এখন।
খেলাপি ঋণ বৃদ্ধি, প্রভিশনিং (খেলাপি ঋণের ঝুঁকি এড়াতে
বাংলাদেশ
ব্যাংকে
প্রতিটা
ঋণের
বিপরীতে
বাণিজ্যিক
ব্যাংকগুলোর অর্থ জমা রাখার নিয়ম) প্রয়োজনীয়তা, মূলধন
ঘাটতি, দুর্বল আস্থা এবং তারল্য চাপ অনেক ব্যাংককে
বেসরকারি খাতে নতুন ঋণ প্রদানে অনিচ্ছুক করেছে। তবে
এখানে
একটি
গুরুত্বপূর্ণ
বৈপরীত্য
লক্ষ্য
করা
যায়।
বেসরকারি
খাতে
ঋণপ্রবাহ
ভেঙে
পড়ার
পরও
কিছু
বাণিজ্যিক ব্যাংক শি
ক্ত
শালী পরিচালন মুনাফা দেখিয়েছে।
এটি ইঙ্গিত করে, ব্যাংকিং খাতের একটি অংশ উৎপাদনশীল
উদ্যোগে অর্থায়নের প্রচলিত ব্যাংকিং কার্যμমের পরিবর্তে
তুলনামূলক নিরাপদ ট্রেজারি উপকরণ ও ব্যালান্সশিট-ভিত্তিক
কার্যμম থেকে আয় করছে। উচ্চ সুদের হার ব্যাংকগুলোকে
তুলনামূলক নিরাপদ সরকারি ট্রেজারি উপকরণে বেশি আয়
করার সুযোগ দিয়েছে, যেখানে তাদের নিয়মিত ঋণগ্রহীতা
আর কেউ নয়, সরকার নিজেই। বেসরকারি খাতে ঋণ
সরবরাহে ঝুঁকি থাকে বলে ব্যাপক খেলাপি ঋণ এবং ঋণ
পোর্টফোলিও
উন্নত
করার
নীতিগত
নির্দেশনার
মধ্যে
ব্যাংকগুলো সরকারকে ঋণ দেওয়ার সুযোগকে বেশি স্বাগত
জানাবে। এর ফলে বেসরকারি খাতের জন্য μাউডিং আউট
ইফেক্ট (ঋণপ্রত্যাশীর ভিড়ে ছিটকে পড়া) তৈরি হয়। এতে
ব্যাংকিং ব্যবস্থা হিসাবের খাতায় মুনাফাযোগ্য দেখালেও
উৎপাদনশীল বিনিয়োগে অর্থায়নের মৌলিক দায়িত্ব পালনে
দুর্বল হয়ে পড়ে। সুদের হার সম্পর্কিত প্রত্যাশাও বিনিয়োগ
বিলম্বিত করে থাকতে পারে। সুদের হার উচ্চ থাকায় অনেক
উদ্যো
ক্ত
া নতুন করে ঋণ নিতে আগ্রহী ছিলেন না। একই
সঙ্গে
অনেকের
ধারণা
ছিল,
দীর্ঘ
সময়
সংকোচনমূলক
মুদ্রানীতি
অনুসরণের
ফলে
মূল্যস্ফীতি
ধীরে
ধীরে
কমবে
এবং
এর
ভিত্তিতে
সুদের হার নিম্নমুখী সমন্বয়ের সুযোগ সৃষ্টি
হবে।
কেন্দ্রীয়
ব্যাংকের
গভর্নর
পরিবর্তনের পরও অনেকে সুদের হার খুব
শিগগির কমার প্রত্যাশা করেছিলেন। কিন্তু
নাজুক
বহিঃপরিবেশ
এবং
অব্যাহত
মূল্যস্ফীতির
চাপ
সুদের
হার
কমাতে
দেয়নি।
সার্বিক
পরিস্থিতি
তাই
বেশ
অস্বাভাবিক।
বাংলাদেশ
একই
সঙ্গে
ঋণের দুর্বল চাহিদা ও ঋণদানে ব্যাংকিং
ব্যবস্থার
দুর্বল
ইচ্ছার
মুখোমুখি।
এই
যুগপৎ ঘটনা অর্থনীতিকে নিম্ন ভারসাম্যের
দুষ্টচেμ ঠেলে দেওয়ার ঝুঁকি তৈরি করছে:
আস্থা দুর্বল এবং সুদের হার উচ্চ বলে
বেসরকারি বিনিয়োগ হচ্ছে না; ঝুঁকি বেশি
বলে ব্যাংকগুলো ঋণ দিচ্ছে না; বিনিয়োগ
ও আমদানি সংকুচিত থাকায় উৎপাদন
দুর্বল
হচ্ছে;
ধীর
অর্থনৈতিক
কার্যμম
নতুন ঋণ প্রদানের যৌি
ক্ত
কতাকে আরও
দুর্বল
করছে।
এই
চμ
ভাঙতে
ঋণ
লক্ষ্যমাত্রায়
পরিবর্তনের
চেয়ে
অনেক
বেশি
কিছু
প্রয়োজন।
এই
পরিস্থিতি
কাটাতে প্রথমেই প্রয়োজন ব্যাংকিং ব্যবস্থা
থেকে সরকারের ঋণ গ্রহণ কমানো; বাজেট ঘাটতি অর্থায়নে
আরও শৃঙ্খলাপূর্ণ পথ অনুসরণ এবং রাজস্ব আহরণ বৃদ্ধির
মাধ্যমে সরকারি অর্থায়নের ভিত্তি শি
ক্ত
শালী করা। একই
সঙ্গে উচ্চ খেলাপি ঋণ নিয়ন্ত্রণ, দুর্বল ব্যাংকগুলোর পুনর্গঠন,
যথাযথ প্রভিশনিং, মূলধন ঘাটতি পূরণ এবং ঋণ অনুমোদন
প্রিμয়ায়
স্বচ্ছতা
আনা
জরুরি।
উৎপাদনশীল
খাত,
রপ্তানিমুখী উদ্যোগ, এসএমই এবং কর্মসংস্থান সৃষ্টিকারী
শিল্পের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক পুনঃঅর্থায়ন সুবিধা, আংশিক ঋণ-
গ্যারান্টি, মেয়াদি ঋণপ্রবাহ বাড়ানোর বিশেষ ব্যবস্থা এবং
ব্যাংকগুলোকে
সরকারি
ট্রেজারিতে
বিনিয়োগের
বাইরে
আনতে নীতিগত প্রণোদনা বিবেচনা করা যেতে পারে।
মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ এখনও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ নীতি-
উদ্দেশ্য। ব্যাংকিং ব্যবস্থা থেকে অতিরি
ক্ত
ঋণ নিয়ে সরকারি
ব্যয় বাড়ানো শুধু বেসরকারি খাতকে μাউড আউট করে না;
সামষ্টিক
অর্থনৈতিক
স্থিতিশীলতা
পুনরুদ্ধার
প্রচেষ্টাকেও
ঝুঁকির মুখে ফেলতে পারে। ঋণপ্রবাহ পুনরুদ্ধারে শুধু কম
মূল্যস্ফীতি ও বেশি স্থিতিশীল বিনিময় হারই যথেষ্ট নয়।
প্রয়োজন বিশ্বাসযোগ্য ব্যাংকিং খাত সংস্কার; শৃঙ্খলাপূর্ণ
সরকারি ঋণ গ্রহণ; উন্নত ব্যবসায়িক আস্থা; বেসরকারি
বিনিয়োগের জন্য পূর্বানুমানযোগ্য নীতি পরিবেশ এবং একটি
স্পষ্ট
নীতি
সংকেতু
যেখানে
উৎপাদনশীল
বেসরকারি
বিনিয়োগকে প্রবৃদ্ধির কেন্দ্রীয় চালিকাশি
ক্ত
হিসেবে বিবেচনা
করা হবে।
আব্দুর রাজ্জাক
